রাজনৈতিক দল মানে তো পৃথক পালঙ্ক, নিজের রাজনীতি হাজির করা ও মোকাবেলারই ব্যাপার। বাংলাদেশে সাধারণত আওয়ামীলীগের তৈরী মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্ম ইস্যুর মোকাবেলা প্রশ্নের বাইরে রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে বাকি রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব কোন মোকাবেলার আলাপ নেই। না জামাত রাজনীতির, না আওয়ামীলীগের রাজনীতির।
ফলে, শত্রু, মিত্র, মাঠ ও মোকাবেলার জায়গাগুলোতে সবাই মূলত আওয়ামীলীগের রাজনীতিই করে, আওয়ামীলীগের ভাব ভোকাবুলারি ও ভাষা ব্যবহার কইরাই। ফলে, দেখবেন, জরুরি মুহূর্তগুলোতে, এমন কি হাসিনার স্বৈরশাসনের মোকাবেলা প্রশ্নেও বাকি সব রাজনৈতিক দলই আওয়ামী রাজনৈতিক ও কালচারাল প্রপোজিশনেই খাবি খায়। যেহেতু তাদের নিজেদের কোন মোকাবেলা নেই।
তাই, এই প্রশ্নটি খুবই জরুরি, যে, আওয়ামীলীগের রাজনীতির মোকাবেলা নিয়া আপনাদের ভাবনা কী, এই প্রেমের বাইরে?
…
বাংলাদেশে আওয়ামীলীগের রাজনীতির যে চেহারা, তার দুইটা চরিত্র।
এক. ফ্যাসিস্ট। দুই. টোটালিটারিয়ান।
আমাদের এইখানে আওয়ামীলীগরে ফ্যাসিস্ট বলা নিয়া কোন কোন গ্রুপের একটা হতোদ্যম অস্বস্তি ও বিরোধিতা দেখা যায়। যে, ইতালির ফ্যাসিস্ট পার্টি বা জার্মানের নাৎসিদের সাথে কি আওয়ামীলীগের রাজনীতিকে এক কইরা মাপার সব শর্ত হাজির আছে? মানে, উনারা গ্রামারে লোক। গ্রামার দেইখা তারপরে ফ্যাসিস্ট ডাকবেন।
আসুন, দেখি।
আওয়ামী রাজনীতিতে সেই সব চরিত্রই মূখ্যভাবে হাজির থাকে, যে যে চরিত্র দেখলে তারে ফ্যাসিবাদ হিশেবে জ্ঞানীরা চিনতেন। যেমন, এক্সট্রিম ন্যাশনালিজম, যেইটারে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদ নামে চিনি, যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অন্যান্য জাতিসত্ত্বাগুলোকে নাকচ করে ও তাদের উপরে নিজের শ্রেষ্টত্ব ঘোষণা করেই শুরু হয়। এই জাতীয়তাবাদ মিলিট্যান্ট আর ঘেন্নাবাদিও, যা ‘বাঙালি’ ছাড়া আর রক্তগুলোরে শত্রু হিশেবে বধ করতে আসে। যেমন, পড়তে পারেন সেই বহুল পরিচিত শ্লোগানরে, ‘ধরে ধরে জবাই কর’, এই অঙ্গনে বেশ জনপ্রিয়। এদের প্রস্তাব হলো, জাতি হিশেবে বাঙালি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির উপরে যেমন শ্রেষ্ঠ, একই ভাবে ‘বাঙালি জাতির জনক’ হিশেবে শেখ মুজিবুর রহমানও ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’, ফলে অন্যান্য বাঙালিদের উপরেও তিনি এবং তার পবিত্র বংশ শ্রেষ্ঠ ও ‘পবিত্র’ও বটেন।
এই ‘জাতিসত্ত্বা’, পবিত্র রক্ত ও শ্রেষ্ঠ বাঙালি মুজিব ধারণা এমন কি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইনডিভিজুয়াল নাগরিক অধিকার থেকেও পবিত্র ও প্রটেকটেড ব্যাপার। দেখবেন, এই রক্ত ও এর উত্তরাধিকার এবং তাদের অনুগতরা নিজেদেরেই কেবল বাংলাদেশের ‘মালিক’ বা উত্তরাধিকার সূত্রে ‘জমিদার’ ভাইবা থাকেন। বিরোধীদেরে নিয়া ওদের কথাবার্তা শুনলে বুঝবেন। যেন, বাকিদের কোন ‘অধিকার’ স্বীকার করা হবে না ‘বাংলাদেশে’। বাকিরা স্রেফ অন্য, অচ্ছ্যুত, ছোটলোক, অপবিত্র, ফলত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তৈরী কইরা তাদেরে আলাদা রাখতে হবে। নাজিদের ‘পবিত্র রক্ত’ ধারণা ও গণহত্যাকাঙ্ক্ষার সাথে মিল খুঁজে পাবেন এইখানে। দেশপ্রেম, সম্প্রদায়প্রেম, শ্রেষ্ঠত্বের অহম, পবিত্র রক্ত এইসব ফেনোমেনন এই আওয়ামীলীগের জনপ্রিয়় টুল, ফ্যাসিবাদেরও যেমন জনপ্রিয় টুল।
…
এইবার আসি অগণতান্ত্রিক, টোটালিটারিয়ান চরিত্র নিয়ে।
গণতন্ত্র একটি ফাঁপা বুলি, পার্টিসিপেটরি গণতন্ত্র আরো এক ধাপ ফাঁপা জিনিশ। সে যাই হোক, এই পার্টিসিপেটরি গণতন্ত্র আমাদের পপুলার গণতন্ত্র-বিশ্বাসের ভিত্তি। বিশ্বাস বলুন, আর যাই বলুন, আমাদের সংবিধান আর জনগণের রাজনৈতিক মিথ, চিন্তা ও তৎপরতা, এই কল্পনার উপরে ভিত্তি কইরা দাঁড়িয়ে আছে। যার ভেতরে বর্তমান বাংলাদেশে বিএনপি জামাত বা অপরাপর বিরোধী দলগুলোর অযোগ্যতার চেয়েও, মূল সমস্যাটা হলো আওয়ামীলীগ নিজেরে এমন একটি দল হিশেবে হাজির করেছে, যে পার্টিসিপেটরি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না।
এর কারণ আছে। মতাদর্শগতভাবে আওয়ামীলীগ চরমপন্থি ও মৌলবাদি। বাংলাদেশে রাজনীতিতে টোটালিটারিয়ান ভাবের জনক। এই ভাবের কালচারাল প্রপোজিশন হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যা হাড়ে মজ্জায় ফ্যাসিস্ট, প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক ও পরমতঅসহিষ্ণু। তাদের বুদ্ধিজীবীদের প্রপাগাণ্ডা ও জ্ঞানীয় জায়গায় গণহত্যাকাঙ্ক্ষাকে দর্শন আকারে হাজিরের চেষ্টা থাকে সব সময়। ইতিহাসে সব সময় তারা পেশিশক্তি ও একনায়কতন্ত্রকেই তাদের পথ হিশেবে বেছে নিয়েছে। সুযোগ পেলেই আওয়ামীলীগ নিজের এই স্বৈরাচারি অবস্থান ঘোষণায় কুণ্ঠিত হয় নাই, ৭৫ এবং আজ তক। ফলত আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং একই সাথে আওয়ামীলীগকে বিলুপ্ত করে বাকশাল দিয়ে প্রতিস্থাপনকারী শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্র যা আছে, তার বাইরেও এই ব্যাপারটির অসন্তোষ, ক্ষোভ ও প্ররোচনাকে কাজে লাগিয়েছিল হত্যাকারীরা।
একই সাথে মনে রাখুন, আওয়ামীলীগ অন্য একটা মুখে, প্রায়ই পার্টিসিপেটরি গণতন্ত্রর কথা বলে। বরং লক্ষনীয়, এর সুযোগ নিয়েই ওরা রাজনীতি করে। যেমন জিয়ার বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে মুজিবুরের বাকশাল ঘোষণায় বিলুপ্ত আওয়ামীলীগ আবার বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ নেয়। এটি নোট করার মত।
এই অবস্থায় যদি আপনি পার্টিসিপেটরি গণতন্ত্রের পক্ষে হন, তাহলে আপনাকে সম্ভবত সবার আগে আওয়ামীলীগের বিরোধীতা করতেই হবে। কিন্তু কীভাবে করবেন?
…
একটা থিওলজি দিয়ে শুরু করা যেতে পারে, আমাদের সংবিধান আর জনগণের রাজনৈতিক মিথ, চিন্তা ও তৎপরতা যে কল্পনার উপরে ভিত্তি কইরা দাঁড়িয়ে আছে।
যেমন একটি পুরনো তর্ক তুলতে পারেন, নীতিগতভাবে, গণতন্ত্রের পরিসরে, গণতন্ত্রের সুযোগ সুবিধা ব্যবহার কইরা আওয়ামীলীগ রাজনীতি করার অধিকার রাখে কি না। যে কিনা ক্ষমতায় এসে খোদ গণতন্ত্রকেই হত্যা করবে। এটি গণতন্ত্রের রাষ্ট্রদর্শনগত প্রশ্ন।
এই থিওলজির কোরবান আরো অনেকেই হতে পারেন। যেমন: গণতন্ত্রের ধ্রুপদি বয়ান বিপ্লবী রাজনীতির কোন জায়গা দিতে অসমর্থ। সুতরাং বাংলাদেশে যারা বিপ্লবী রাজনীতি করতে চান এবং তার গণতান্ত্রিক অধিকার চান, তাদেরেও এই প্রশ্ন মোকাবেলা করতে হবে। আবার যারা ধর্মীয় রাজনীতি করতে চান, এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণা অস্বীকার করেন, তাদেরও এই প্রশ্নটির যথার্থ উত্তর দিয়েই রাজনীতি করতে হবে। যেহেতু উভয়েই গণতন্ত্ররে রাষ্ট্রদর্শন আকারে অস্বীকার করে, বরং গণতন্ত্রের কাঁধে সওয়ার হয়ে গণতন্ত্র হত্যা করতে তৎপর হবে।
আপনি বরং এই কোরবানিগুলো মেনে নিয়েই অগ্রসর হতে পারেন, যদি পার্টিসিপেটরি গণতন্ত্র আপনার আরাধ্য হয়।
প্রথম প্রকাশ: এপ্রিল ২৭, ২০১৫
পুনমুদ্রণ, মধ্যবর্তি বেঞ্চটাতে। পৃষ্ঠা ২০২। দুয়েন্দে পাবলিকেশন্স। ফেব্রুয়ারী ২০২৫

