Interviews

যুবা রহমান

আমার কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একটা ধর্মরাষ্ট্র তৈরির বিরোধী আমি । রিফাত হাসান

May 18, 2026   0 comments   12:59 pm
Untitled 1

আদর্শ তো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, ক্ষমতা আদর্শ দিয়ে চলে না, আদর্শের চাইতেও, তাকে একটা ‘আদর্শবাদ’ তৈরি করতে হয়। এইটারে একটা হেজেমনিয়াল টুলে রূপান্তর করতে হয় প্রথমে। এই আদর্শবাদগুলো, বা আদর্শভিত্তিক সমাজকাঠামো রিজিড চরিত্রের, কনফিউজিং ও নিপীড়নমূলক ঘটনাও। যেমন, এনিমেল ফার্মের শুয়রেরা, সম্ভবত সেভেন কমান্ডমেন্টস ব্যবহার করত অন্য পশুদের উপর ডমিনেন্সির বৈধতা তৈরির জন্য, শেখ হাসিনা যেমন মদিনা সনদ ও মুক্তিযুদ্ধ ব্যবহার করতেন জনগণের ওপর ডমিনেন্সি বজায় রাখার বৈধতা তৈরির জন্য। আদর্শভিত্তিক সমাজকাঠামো মানে কিন্তু এই রিজিড অবস্থাই।

Share

কথার মধ্যে দিয়া চিন্তাভাবনা কেমনে টিইকা থাকে, কেমনে বাড়তে থাকে এই জিনিসগুলা মনেহয় আমি টের পাইতে পারি। এইজন্য কথাবার্তা আমার কাছে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় আনন্দগুলার একটা। একজন লেখক / আর্টিস্টের সাথে আলাপের সময়টা খুবই এনজয় করি। আমাদের এখানে আলাপের এক ধরনের কাঠামো আছে। সাক্ষাৎকারের নামে প্রশ্ন কৈরা বিপাকে ফেলানোর টেনডেনসি আছে। এর উল্টাও আছে, শুধু জিজ্ঞাসার মাধ্যমে জানামূলক আলোচনা। এই দুইটাতে খুব একটা যাইতে চাই না। বরং একজন লেখক/ আর্টিস্টের চিন্তার কাছাকাছি যাইতে চাই। কেমনে চিন্তা করেন, সেই তরিকা বুঝতে চাই। অনেক দিন পর রিফাত ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ কৈরা সেই ফিলিংসটা পাইলাম। যদিও আমার মনে হৈছে, নানা কারণে আমি নিজেই আলাপে ততোটা হাজির থাকতে পারি নাই। ওই খামতিটুক রিফাত ভাই কাটায়া নিছেন। আমার কাছে শান্তি এইটুকুই, রিফাত ভাইয়ের সঙ্গে আলাপের শুরুটা হৈল। চিন্তা যেহেতু থাইমা থাকে না, এই কারণে কথার ধারাও থামবে না। সামনের দিনে আলাপে এই আলাপটাই বেইজ হিসেবে কাজ করবে। আর রিফাত ভাই ট্যাগ দেয়ার কারণে অন্তত বিশ জনের রিকু পাইলাম, এইটাও কম কিসে সময়ের আলোকে থ্যাংকস, বিশেষ থ্যাংকস হাসসান আতিক কে, বড় স্পেস দেয়ার জন্য। সময়ের আলোর ঈদ সংখ্যার লিংক কমেন্টে থাকল।/ যুবা রহমান। শিরোণাম: সময়ের অন্যতম বুদ্ধিজীবী রিফাত হাসানের সাক্ষাৎকার। সময়ের আলো। ঈদ সংখ্যা। ২০২৬।

যুবা রহমান : রিফাত ভাই, একটা ‘যদি’ দিয়ে আলাপ শুরু করতে চাই! ধরেন, আপনি বাংলাদেশে না জন্মায়া পৃথিবীর অন্যত্র জন্মাইলেন, তা হলেও কি আপনে এ ধরনের চিন্তাভাবনা করতেন? বা আগামীকালই যদি আপনারে ইউরোপ বা আমেরিকায় পাঠায়া দেওয়া হয় তা হলে কি এখনকার চিন্তা কনটিনিউ করবেন?

রিফাত হাসান : দেখুন, আমি অন্য কোথাওর চাইতে, সম্ভবত, অন্য কোনো সময়ে ফিরতে চাইতাম। আমাদের তো নানান রকম কারাগার আছে, যেমন, চিন্তা ও সীমানা। আমি এমন সময়ে যেতে চাইতাম, যখন মানুষের রাষ্ট্র ও সীমানা ছিল না। আমরা তো, এখন, একটা মুগ্ধতাহীন সময়ে বাস করি। আমি ফিরতে চাইতাম, যখন মানুষের মুগ্ধতাগুলো বেঁচে ছিল। গিলগামিশের সময়ে, বা, হজরত খিজিরের সঙ্গে হজরত মুসার নৌকাভ্রমণের সময়ে, তাদের পাশে বসতে চাইতাম। বা, যদি আমি খুব কাছাকাছি কোনো সময়ে জন্ম নিতাম, তখন হয়তো ইতিহাসে বাগদাদ, নিশাপুর, বোখারা বা সমরখন্দের উত্থানের সময়গুলো বেছে নিতাম। বা, আরও বহু আগে যদি যেতে চাইতাম, মহাভারতের সময়ে, যখন মুহূর্তরে থামিয়ে মহামতি শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের প্রতি হিতোপদেশ দিচ্ছেন, বা, কপিলাবস্তুর রাজপুত্র সিদ্ধার্থ যখন সংসার ছেড়ে বেরোলেন, বা, আরও বহু পরে, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বুড়ির কাঁটা সরিয়ে সরিয়ে মক্কার রাস্তা পার হচ্ছেন, জন্মভূমি ছাড়ছেন মদিনার পথে, বা হজরত আবু জর গিফারি যখন খেলাফতের টেরিটরি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, তাদের ধুলো হতে চাইতাম। মানে, আমরা এখন যে ভেলুগুলোর কেন্দ্রে আছি, তার জন্মমুহূর্তে যদি থাকতাম, বা, তারও আগে, ধরুন, একটা নৈরাষ্ট্রের মুহূর্তে যদি থাকতাম, আমি এরকম ভাবি সময়। আমরা তো আইডিয়ার নানান কারাগারের ভেতরে আছি আসলে। জাঙ্ক।

Eid magazine 2026 Extract

এর বাইরে, শুনতে মজার মনে হলেও, বাংলাদেশে না জন্মানো তো, রিয়েলিটি হিসেবে সম্ভব না আমার। মানে, অন্য কোথাও জন্মালে, তা তো জৈবিকভাবে আমি হতাম না, অন্য কেউ হতাম। তবে, ধরেন, আমারে আল্লাহ এই সুযোগ দিয়া দিলেন, তখন কি এভাবে চিন্তা করতাম? যেহেতু মানুষ তার ইতিহাসের অংশ, একইভাবে চিন্তা করলেও, ফর্ম একই রকম হইত না। বা, ধরুন, ইউরোপের লোকেরা দ্রুত হাঁটে, মনে হয় ট্রেন চলে যাচ্ছে, দৌড়ায়, এশিয়ার লোকেরা, স্বভাবে আমার মতো ধীরে হাঁটতে পছন্দ করে, যেন, যেখানে যাবার, সেখানে হেঁটে পৌঁছুবার অবসর আছে। তো, আমিও যদি অন্য কোথাও জন্মাতাম, হয়তো তখন, তাদের মতো দ্রুত হাঁটতে অভ্যস্ত হতাম, কিন্তু, আমার মনে হয়, হয়তো তখনও অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে না হবার, থেমে জিরোবার, বসে অপেক্ষা করবার অবসর নিয়া ভাববার চেষ্টা করতাম, কোনো না কোনোভাবে।

রিফাত হাসান : দেখেন, যা আছে, তা ঠিক থাকার আলাপ তো, কম গুরুত্বপূর্ণই। এইটার জন্য আইন, পুলিশ ও মিলিটারি দরকার হয় বেশি করে, আলাপের চাইতে। আমি, যদিও, একটা মধ্যবর্তী অবস্থার কথা ভাবি সবসময়, কিন্তু, এইটা তো যা আছে তার ঠিক থাকা ও না থাকার অনুমান দিয়ে ধরা সম্ভব না। ঠিক থাকা তো পারফেকশন। দুনিয়া তো পারফেকশনের জায়গা না, একটা ইমপারফেক্ট ব্যাপার, ইনকমপ্লিটনেস থাইকা যায়। দুনিয়াতে একটা পারফেক্ট রিয়েলিটি হাজের নাজের আছে, এইটা, এক ধরনের ইউটোপিয়া না? এইখানে পারফেক্ট রিয়েলিটি নির্মাণ যেহেতু সম্ভব না, ফলে, একটা অধরা থাইকা যায়। একটা রিয়েলিটি ও ট্রুথ খোঁজার সাধনা চলে মানুষের। ফলে, আমরা কবিতা, শিল্প, রাজনীতি ও প্রেম করি। মানে, কিছু একটা না থাকার আলাপ, আর কিছু একটার জন্য ভ্রমণ, হাজার বছর ধরে পথ হাঁটিতে থাকা, সেই, নিশীথের অন্ধকার মালয় সাগরে।

এর বাইরে, এইটাতে বোধহয় মহামতি মার্কসেরও অল্প ভূমিকা আছে। তৎপরতাহীন দর্শনকে মার্কস এক ধরনের অকর্মণ্য বলেছেন, এইটা পপুলারলি এখানকার বুদ্ধিজীবীদের প্রভাবিত কইরা থাকতে পারে। মার্কসের উক্তিটির কাছাকাছি অনুবাদ এরকম, দার্শনিকেরা এখনতক দুনিয়ারে কেবল ব্যাখ্যা করলেন, অথচ দরকারি কাজ হলো দুনিয়া বদলে দেওয়া। তো, সবাই বদলানোরে দর্শনেরও কাজ ভাবতে অভ্যাস করে।

রিফাত হাসান : সম্ভবত, এই নন অ্যাকশনে, একটা বুড্ডিস্ট ভাব আছে। আমি কোথাও খেয়াল করেছি, বুড্ডিজমে অভিপ্রায়রেই কর্ম ধরা হয়, অ্যাকশনের চাইতে। তবে, অন্য ধর্মেও, যেমন ইসলামেও পাবেন কাছাকাছি চিন্তা। নিয়াত, মানে ইনটেনশনরেই কর্ম ধরা হয় ইসলামেও। কিন্তু, আপনি খেয়াল করবেন, ইসলামে ইনটেনশনটা তেমন কইরা ইনঅ্যাকটিভ কোনো ঘটনা না। ফলে, জিহাদ, মানে পরিবর্তন ও লড়াইয়ের কথাও বলা হয় এখানে। ফিলসফিক্যালি, সম্ভবত, আমি নন অ্যাকশনের পক্ষের লোক হব, ফোর্স, মানে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে। তবে, পলিটিক্যাল থটের চাইতে, এইটা পরিবেশ ভাবনা হিসেবে ভালো। যেমন, প্রকৃতির ওপরে প্রভুত্ব করার চাইতে, প্রকৃতিতে এজ-ইজ, একাত্ম হওয়ার একটা আলাপ আছে, এই আলাপটা কোথাও রবীন্দ্রনাথও করেছেন। কিন্তু, নন অ্যাকশন, রাষ্ট্রে এইটা কতটা সম্ভব? বিশেষত, ডিসকোর্সের দিনে কি নন অ্যাকশন সম্ভব? কারণ, ডিসকোর্স নিজেই তো নির্মাণ, নেচারাল কোনো ঘটনা না।

দেখুন, আমরা যে সোসাইটিতে আছি, তার রুহ হলো ধর্ম। এখানকার বৃহৎ জনগোষ্ঠী মুসলমান। হিন্দু আর বৌদ্ধরাও আছে প্রচুর পরিমাণে। দেখবেন, তাদের চরিত্র হলো ধার্মিক। ধর্মীয় ভ্যালুগুলো প্রাধান্য পায় জীবনযাপন ও সব মীমাংসায়, কিন্তু, এখানকার মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ সবাই একটা টলারেন্ট সোসাইটি ও স্পিরিচুয়াল মাইন্ড বিলং করে। এখানকার মুসলমানদের যে পরিচয়, তারে আমরা বাঙালি মুসলমান বলি। এই বাঙালি মুসলমান ব্যাপারটা এমন, এখানে আরব থেকে আগতরা ব্যবসায়ি ও সুফিরা যেমন, ইতিহাসের নমঃশূদ্র, চণ্ডাল, দলিত, কৃষিজীবী, কাঠুরে, জেলে ও আর আর বর্ণহীন, অনার্য স্বাধীন নৃগোষ্ঠীও সমহিমায় বিরাজ করে, বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে। ফলে, দেখবেন, পাশের দেশ ভারতে যে ধর্মীয় ইনটলারেন্স, উগ্রতা, গরুর গোশত খাওয়ার অপরাধে পিটিয়ে মানুষ খুন, এরকম আমাদের নেই। একটা চমৎকার স্পিরিচুয়াল মাইন্ড এবং ধর্মীয় সহাবস্থান, এখানে পাশাপাশি চলে। মানে, ধার্মিক হলেও, মুআমেলাতে সেক্যুলার থাকতে পারি আমরা।

রিফাত হাসান : হাঁ, কনসাসলি। যদিও, সম্ভবত, নিয়মিত না হলেও, আমিও অল্প আধটু গাইল খাই। তবে, আমি কনসাসলি দুইটা কাজ করি। এক. একটা গণতান্ত্রিক আলাপের পরিসরে থাকার চেষ্টা করি, এইটা আমার রাজনীতির অংশ। কোনো ব্যক্তিরে শত্রু তৈরি করি না, যেহেতু অ্যাকটিভিস্ট না আমি। আইডিয়া নিয়া কথা বলি। ফলে, ব্যক্তিরা কম শত্রু হন আমার, যদি ব্যক্তি আমারে পড়তে, বা চিন্তা করতে সক্ষম হন। দুই. মূর্খদের সঙ্গে কোনো আলাপে যাই না, তাদের আলাপের সুযোগও রাখি না, যেহেতু ওনারা ব্যক্তিরে হার্ম কইরা আলাপ করেন। এই ব্যক্তিরে হার্ম করার ঘটনা হলো রিঅ্যাকশনারি অ্যাক্ট, অপিনিয়ন বা লেখালেখির ক্রিটিক না। এমন না যে, সবাই ক্রিটিকই করবেন, কিন্তু ব্যক্তির ওপর আক্রমণ করবেন না, এইটা যেকোনো পাবলিক স্পেসে কথাবার্তা ও আলাপ-আলোচনার জন্য প্রিজিউমড নর্ম। যেহেতু আলাপ মানে যুদ্ধপরিস্থিতির বিপরীত ঘটনা ও অন্তত এই আলাপের পরিসরে ও ভেতরে একটি গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি আছে, এই ধরনের পূর্বানুমান। এই গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি যাতে বহাল থাকে, আলাপ ও আলাপকারীর মর্যাদা যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, আমি খেয়াল রাখি। এইটা আমার রাজনীতিরও অংশ। এ জন্যই হয়তো, আপনি গালাগাল কম দেখতে পান।

রিফাত হাসান : গণআন্দোলন, যেইটা শেষে অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হলো, এইটারে নিয়ে আমার প্রথম বোঝাপড়া হলো, এইটা রাজনৈতিক দলগুলোর ছিল না তেমন কইরা, বহুদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর অনুপস্থিতিতে রাজপথে তৈরি হতে থাকা ছাত্রদের ছিল। এরা বহুদিন ধরে তৈরী হয়েছে, রাজপথে, একা একা, রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরেই, নানান চেহারায়। সর্বশেষ, জুলাইয়ে নিজেদের আন্দোলনকে ওরা গণের করে তুলতে পেরেছে এবং সাধারণ মানুষের দুয়ার পর্যন্ত নিয়ে যেতে পেরেছে, মিথের কেন্দ্র ও কাবাগুলো ভেঙেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে আন্দোলন। এবং দ্বিধান্বিত রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করেছে রাজপথে নামতে। রাজনৈতিক দলগুলো, এক প্রকার বাধ্য হয়েই, প্রকাশ্যে নানান রকমভাবে অস্বীকার করতে করতে, এক প্রকার হীনম্মন্যভাবে রাজপথে নেমেছে, পরিচয়হীনভাবে, যাতে দরকারে নিয়মতান্ত্রিক পরিচয়ে ফেরত আসতে পারে, আবার, সফল হলে এর ফলাফলরে ঘরে তুলতে পারে। যাদের এই পরিকল্পনা ছিল না, তারা শহিদ হয়েছেন এবং প্রকাশ্যে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের কোনো গোপন ব্যাপার ছিল না। ফলে অভ্যুত্থান সফল হলো এবং ফ্যাসিস্টের পতন হয়ে গেল। এই জায়গা থেকেই আমি এর পরের বাংলাদেশ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সংকট ও দ্বিধাগুলোকে দেখি।

রিফাত হাসান : প্রাপ্তি, একটা উপসংহারের ধারণা তৈরি করে, যা প্রায় ভুয়া ব্যাপার। বরং পথটাকে বোঝা জরুরি। আকাঙ্ক্ষাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে রাখি, গণঅভ্যুত্থান হলো একটা জাতির জন্য দার্শনিক বোধোদয় ও ফয়সালার মুহূর্ত। আমাদের তো অনেকগুলো কারাগার তৈরি হয়েছিল দীর্ঘ সময় ধইরা, যেমন ভয়, নানান মতাদর্শিক কুয়া, দুঃশাসন, রক্ষণশীলতা। এর আগ পর্যন্ত, আমাদের সমাজের একটা অংশকে আদার করে দিয়ে নানান উইচহান্টিং হতো, যার আছর এখনও আছে। দর্জি বিশ্বজিৎ কুমার দাস আর বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ, দুইটা ভিন্ন চরিত্র ও পরিচয়ের মানুষ, কিন্তু উভয়রেই পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় স্রেফ একটা একই ধরনের উইচ পরিচয় নির্মাণ করে, যার নাম ‘শিবির’। এরকম আরও আরও উইচ ছিল, যেমন, ‘রাজাকার’, সর্বশেষ যখন শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের রাজাকারপুত্র কইলেন। সেই জন্য, দেখবেন, গণঅভ্যুত্থানের সময়ের সবচেয়ে ইফেকটিভ স্লোগান ছিল, তুমি কে, আমি কে, রাজাকার। বিরোধীদের গুম করার জন্য নানান রকম আয়নাঘর তৈরি করা হলো। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ অনেক গুমের তো এখনও কোনো হদিসই পাওয়া যায় না। রাজনীতিতে, আমরা একটা শেখ মুজিবুর রহমানের তৈরি করে দেওয়া ধর্মযুদ্ধের ভেতরে ছিলাম, যেটি ফ্যাসিস্ট শাসনের প্রাণভোমরা ছিল। যা শুরু হয়েছিল মুসলমানি ধর্ম চিহ্ন ও পরিচয়রে আমাদের গণমুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি ও পরস্পরের শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে, যার শুরু হয়েছিল বাহাত্তরের সংবিধান থেকে, পরে, একদলীয় বাকশাল ও শেখ হাসিনার গণজাগরণ মঞ্চ ছিল যার সিলসিলা। অবশ্যই, আমি সচেতনভাবে মনে রাখি, এর দায় উনিশশ একাত্তর সালে যারা ইসলামের নামে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধিতা করেছিল ও জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, হানাদারদের সমর্থন করেছিল, তাদেরও নানানভাবে আছে। আমি তাদেরকে ইতিহাসহীন বলি ও রাজনীতিতে তাদের অবস্থান পরিবর্তনের থিসিস পরিস্কার করার কথা বলি।

তো, দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট রেজিমের পরে, গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে আমাদের এই সব ধরনের কারাগারগুলোর থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল। ছাত্ররা একটা অসম্ভব স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিল। কিন্তু, যে কোন বিপ্লবেই কায়েমি স্বার্থগুলোর একটা আত্মসাতের ঘটনা থাকে, এখানেও, এই ঘটনা আছে। ফলে, এইটার পূর্ণতা হয় নাই। এ কারণেই, রাষ্ট্রের খোলনলচে পরিবর্তনের চাইতে একটা জুলাই সনদ মাত্র হল, যে জুলাই সনদ নিয়াও, এখন নানান অস্পষ্টতা তৈরী হয়েছে। আমার অবস্থান ছিল, স্রেফ জুলাই সনদ না, এইটা মূলত একটা নতুন সংবিধান তৈরির মোমেন্টামই, যেহেতু বিগত দিনগুলোতে সংবিধানের এমন পুলিশি চেহারা দেওয়া হইছে, তারে বহাল রাইখা কোনো পরিবর্তন সম্ভব না। খোদ সংবিধানই যে কোন পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লেফটেনেন্ট জেনারেল হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, এই পঞ্চাশোর্ধ বছর বয়সি সংবিধান, জুলাইয়ের জেনোসাইডের দিনে ছাত্র ও নাগরিকদের জীবনের রক্ষাকবচ হিশেবে ফ্যাসিস্টের বন্দুকের বিরুদ্ধে নৈতিক ক্ষমতা আকারে দাঁড়াতে পারে নাই। ফলে, জুলাইয়ের অভ্যুত্থান সংবিধানের এই না দাঁড়াতে পারার, অক্ষমতার, জনগনের পক্ষে এথিক্যাল অথরিটি হিশেবে থাকতে না পারার বিরুদ্ধেও ছিল, যা অনেকেই পড়তে পারেন নাই, বা পড়ার জন্য তৈরী না। অথচ, সংবিধান হল মূলতই একটি জনগোষ্ঠির এথিক্যাল অথরিটির প্রশ্ন, আইনের প্রশ্ন না।

ফলে, আমি বলেছিলাম যে, এই এথিকাল অথরিটি ও রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে অভ্যুত্থানের দার্শনিক মুহূর্ত থেকে নতুন সংবিধান প্রয়োজন। ফলে, জনঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াইরত দলগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটা সর্বদলীয় অভিভাবক কাউন্সিল গঠনের ধারণার কথা বলেছিলাম, যারা গণঅভ্যুত্থানের বিপ্লবী দলিল তৈরি করবে ও নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে। কিন্তু, নতুন সংবিধান গ্রহণের ধারণা নিয়ে বোধহয় এসটাবলিশড রাজনৈতিক দলগুলো স্ট্যাটাস কু হারানোর ভয়ে ছিল, তারা একমত হতে পারে নাই। দেখবেন, সারা জীবন নতুন সংবিধান নিয়ে আলাপ করা হাসনাত কাইয়ুম সাহেবদের দলও, বড় দলগুলোর সুরে নিজেদের কণ্ঠরে ছোট করে নিল, আমরা যখন নতুন সংবিধানের কথা কইলাম। তারা বলল, এখনই নতুন সংবিধান চান না, অক্ত আসে নাই, তারা বিদ্যমান সংবিধানের সংশোধন চান, ইত্যাদি। বিএনপি তো এর বিরুদ্ধে ছিলই। ফলে, এই নিয়ে কোনো কনসেনসাস দাঁড়াল না, এবং নতুন সংবিধানের ধারণার ইতি ঘটল। স্রেফ জুলাই সনদে থিতু হলো।

রিফাত হাসান : হু। এইটা একটু ঠাট্টা করেই বলেছিলাম, উপদেষ্টাদের শাসনকে। প্রথমত, ইন্টারিম, এইটা একটা কিম্ভূত ফর্ম। এই সময়কার শাসন নিয়া আমার মন্তব্য ছিল, আমরা প্লেটোর দার্শনিক রাজার শাসনে এসে পড়েছি, লুটেরাদের শাসনের পতন ঘটিয়ে। যারা একটা গাইডিং অথরিটি ও অভিভাবক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু শাসক হওয়ার যোগ্যতা উনাদের নেই। এবং প্রশ্ন করেছিলাম, আমাদের মধ্যবর্তি বেঞ্চটা কোথায়?

এই জায়গায়, আমি মনে রাখি, বাংলাদেশে একটা ঐতিহাসিক জামায়ত ট্যাবু আছে, যেইটা মূলত আইডিওলগ বাম সমস্যা, আওয়ামী লীগের তৈরী করে দেওয়া, আরও বিশেষভাবে কইতে গেলে, ভারতের তৈরি করে দেওয়া। এই ইস্যুতে ভারতীয় কূটনীতিকদের সরাসরি ইন্টারভেনশন থাকত বইলা অভিযোগ ছিল। এইখানে, খেয়াল করবেন, আমি তাদের জোটের বিরোধিতা করলেও, আমি মনে করি, নাহিদরা রাজনীতিতে আইডিওলগদের এই জামায়াত ট্যাবুরে কিছুটা হার্ম করতে পেরেছে। ফলে, এই জোট গঠনরে কৌশলগতভাবে ভুল বলেছি আমি, কিন্তু, এথিকাল সমস্যা না।

রিফাত হাসান : নির্বাচন তো অভূতপূর্ব হল। এই নির্বাচনে আমি কিছু মন খারাপসহই অসম্ভব খুশি, এরকম লিখেছিলাম। কারণ, বহুতদিনের পরে আমরা ভোট দিতে পারলাম। এই সাধারণ ভোট দিতে চাওয়ার ব্যাপারটাই বহুদিন ধইরা একটা রেডিকাল ঘটনা ছিল, আমাদের থেকে এই অধিকার হরণ করে রাখা হযেছিল। দুই. গণভোটে হাঁ জয়ি হল, যেইটা নিয়া আমার আগ্রহ ছিল। হাঁ এর জয় মানে, নতুন সংবিধান বা আমরা যে পরিবর্তনগুলোর কথা বললাম এতদিন ধইরা, তা পুরোপুরি সম্ভব না হইলেও, তার কাছাকাছি কিছুর পক্ষে জনগনের ম্যান্ডেট পাওয়া গেল। এইটা, ছাত্রদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার জয়, যারে নিয়া দ্বিধা তৈরী করা হইতেছিল নানান ফর্মে।

রি.হা. : নির্বাচন প্রক্রিয়া, আমার যেটুকু নজরে পড়েছে, স্বচ্ছ মনে হইছে। বিপুল ভোটারের অংশগ্রহণ ছিল। তবে, কোথাও একটু তাড়াহুড়ো বোধহয় ছিল। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ দেখা গেলেও, গণনা ও রেজাল্ট প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, যেমন এগারো দলীয় জোটের করা অভিযোগগুলো, নির্বাচন কমিশন এগুলোরে আমলে নিয়ে অভিযুক্ত আসনগুলোতে পুনর্গণনার আদেশ দিতে পারত। কিছু কিছু আসনের রেজাল্ট প্রকাশে দেরি সন্দেহ তৈরি করেছে। কোন অজানা কারণে, এই অভিযোগগুলোর আর সুরাহা হয় নাই। স্রেফ রাজনীতির মাঠেই অভিযোগগুলো রয়ে গেল, যার সহজ সুরাহা হতে পারত।

রিফাত হাসান : এখনতক, ঠিক অখুশি না, কিন্তু অস্বস্তি আছে। যেমন, নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপর যা হল, তার জন্য, বলতেই হবে, আমরা তেমন কইরা প্রস্তুত ছিলাম না। একটা কনফিউজড পরিস্থিতি তৈরী হল। গণভোটের ফলাফলরে অগ্রাহ্য করা হল। বিএনপি জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিল না। জুলাই সনদ আর গণভোট নিয়া একটা নজিরবিহীন রিট, এমন কি হাইকোর্টের একটা রুলও জারি হল, দেখবেন। মানে, এইখানে আদালতের কান্ধে বন্দুক দিয়া জনম্যান্ডেটরে পাল্টানোর একটা পুরনো আগ্রহ দেখা গেল। এইটারে বোনাফাইড হিশেবে দেখা সম্ভব না। শেষমেষ, এই ঘটনাটা, জাতীয় সংসদে যে কোন দলের এবসলিউট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়া আমাদের পুরনো ভয়ের ব্যাপাররে বাড়িয়ে দিল।

রিফাত হাসান : আমি কিছুটা বিস্মিত। দীর্ঘ আওয়ামী নির্যাতনের ভেতরেও তাদের ভোট ও আসন উভয়ই যথেষ্ট বেড়েছে। বাংলাদেশের মানুষ, আমার সাধারণ অনুমান হলো, ধর্মভীরু ও ধর্মীয় মূল্যবোধরে গুরুত্ব দেয় বটে, কিন্তু, একই সঙ্গে রাজনীতিতে উদার পন্থারেই গ্রহণ করে। এই জায়গা থেকেই, আমি বিএনপিরে বাংলাদেশে ধার্মিকদের সেক্যুলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চিহ্নিত কইরা আসছি বহুদিন ধরে, যার শক্তি ও দুর্বলতা হলো, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নিয়া দাঁড়ানো। বিএনপির এই রাজনীতির বিপরীতে, ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের গণভিত্তি ছিল না তেমন কইরা। তবে, বোধহয় কিছু নতুন করে প্যারাডাইম শিফট হচ্ছে। দুইটা ঘটনা এর কারণ হতে পারে। এক. বিএনপির এই চরিত্র গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অস্পষ্ট ও কনফিউজিং হয়ে গেছে, ফলে জামায়াত এই ধারণা ও সমর্থকদের কিছু কিছু দখল নিতে পেরেছে। দুই. আমি খেয়াল করেছি, বহু বছর ধইরা শেখ হাসিনার অধীনে টিকে থাকতে গিয়ে তারা মানুষের কাছে যাবার ও সেক্যুলার হয়ে উঠতে চাওয়ার মেচিওরিটি অর্জন করেছে। এইটা, আমার ধারণা, তারা খালেদা জিয়ার বিএনপি থেকে শিখেছে। ফলে, জামায়াতের ছাত্রসংগঠন বিস্ময়করভাবে প্রায় সবকটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল এর আগে, যেখানে তাদেরকে ভোট দেওয়া সবাই তাদের সমর্থক হবার সম্ভাবনা অতিকল্পনা হবে। পরে, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে, দ্বিতীয় বৃহত্তর দল হিসেবে আবির্ভূত হলো জামায়াত, এইটারে, বিস্ময়কর মনে হলেও, আপাতত আমার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হিসেবে রাখছি।

রিফাত হাসান : সেই সময়ে, আমি গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা ছাত্রদের দল হিসেবে, ওল্ড স্কুল পলিটিকসের বিপরীতে এনসিপির নিজের রাজনীতি নিয়ে দাঁড়ানোর পক্ষে ছিলাম। বইলা রাখি, এখনও তাই আছি। তার বিপরীতে, এনসিপির স্রেফ একটা নির্বাচনি জোট হইয়া ওঠার আকাঙ্ক্ষারে আমি ক্ষতিকর মনে করেছিলাম, যা একদা চারদলীয় জোটেরও একটা একাট্টা রাজনৈতিক চেহারা দাঁড় করিয়েছিল। অথচ, রাজনীতি তো পৃথক পালঙ্কই। সবার আলাদা রাজনীতি আছে বলেই আলাদা দল। কিন্তু হাসিনার সময়ের রাজনীতিতে আপনি বিএনপি জামায়াতের আলাদা চেহারা দেখতে পাবেন না। এই আলাদা চেহারা না দাঁড়ানো উভয় রাজনৈতিক দলের জন্য ভালো হয় নাই। আমার মত ছিল, রাজনীতিতে কৌশলগত মৈত্রী হতে পারে যেকোনো দলের সঙ্গেই, কিন্তু পরিচয় বিলিন করে দেওয়া জোট নয়। এই ধরনের ফর্মে শরিকদের রাজনীতি হারিয়ে যায়। ফলে, যার সাথেই জোটে যাবে, মির্জা ফখরুল বা ডা. শফিকের পাশে একটা ছোট ও কুসুম রাজনৈতিক দল, যেমন গণসংহতি ইত্যাদি হয়ে ওঠার আশঙ্কা ছিল।

দুনিয়া তো পারফেকশনের জায়গা না, একটা ইমপারফেক্ট ব্যাপার, ইনকমপ্লিটনেস থাইকা যায়। দুনিয়াতে একটা পারফেক্ট রিয়েলিটি হাজের নাজের আছে, এইটা, এক ধরনের ইউটোপিয়া না? এইখানে পারফেক্ট রিয়েলিটি নির্মাণ যেহেতু সম্ভব না, ফলে, একটা অধরা থাইকা যায়। একটা রিয়েলিটি ও ট্রুথ খোঁজার সাধনা চলে মানুষের। ফলে, আমরা কবিতা, শিল্প, রাজনীতি ও প্রেম করি। মানে, কিছু একটা না থাকার আলাপ, আর কিছু একটার জন্য ভ্রমণ, হাজার বছর ধরে পথ হাঁটিতে থাকা, সেই, নিশীথের অন্ধকার মালয় সাগরে।

রিফাত হাসান : আদর্শিক? তেমন কইরা, না। কৌশলগত জোট তো ঠিক আদর্শিক হয় না। গন্তব্য নিয়া ঠিক হয়। ফলে, দেখবেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে আওয়ামীলীগের মত সংগঠনের সাথেও জামাতের জোট হইতে পারছিল। এই জাগায়, আমাদের এখানে জামাতের সাথে জোট নিয়া যে আপত্তিগুলো আছে, তার বড় অংশই, মূলত ছুঁতমার্গ। আগের সময়েও, এখনও, এই মৌলবাদী ছুতমার্গগুলোকে আমি সমস্যা হিশেবেই পড়েছি। এইটা হাসিনার সময়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোটের কালেও, আবার, এই সময়ে আইসা জামাতের সঙ্গে এনসিপির জোটের কালেও। এই জায়গায়, আমি মনে রাখি, বাংলাদেশে একটা ঐতিহাসিক জামায়ত ট্যাবু আছে, যেইটা মূলত আইডিওলগ বাম সমস্যা, আওয়ামী লীগের তৈরী করে দেওয়া, আরও বিশেষভাবে কইতে গেলে, ভারতের তৈরি করে দেওয়া। এই ইস্যুতে ভারতীয় কূটনীতিকদের সরাসরি ইন্টারভেনশন থাকত বইলা অভিযোগ ছিল। এইখানে, খেয়াল করবেন, আমি তাদের জোটের বিরোধিতা করলেও, আমি মনে করি, নাহিদরা রাজনীতিতে আইডিওলগদের এই জামায়াত ট্যাবুরে কিছুটা হার্ম করতে পেরেছে। ফলে, এই জোট গঠনরে কৌশলগতভাবে ভুল বলেছি আমি, কিন্তু, এথিকাল সমস্যা না।

রিফাত হাসান : মোটেই না। তবে, রাজনীতি যদিও নীতিশাস্ত্রের বাইরের ঘটনা না, আমি মনে করি, ‘নীতি’, মানে এথিকাল থাকার জরুরতের সঙ্গে কৌশলগত মৈত্রীর যে এথিকস নিয়া আলাপ হয় আমাদের এখানে, তা মূলত এথিকস না, রাজনীতির গন্তব্য পরিষ্কার না থাকা। দেখবেন, কোথাও আপনার গন্তব্য যতবেশি পরিষ্কার হবে ততবেশি রক্ষণশীলতাহীন থাকতে পারবেন আপনি, এইসব সেকেলে সংস্কার, যদি আরও স্পষ্ট কইরা বলি, আওয়ামী রিঅ্যাকশনারীদের তৈরি করে দেওয়া সংস্কার, বা ডান বাম মৌলবাদীদের, বাধা দেবে না। যেমন, জুলাইয়ের সময়ের জনপ্রতিরোধ। দেখবেন, এখানে সবাই একসাথে হইতে পারছিল, কোন রক্ষণশীলতা ছাড়াই।

রিফাত হাসান : নির্বাচনে এনসিপি ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করেছে। ছাত্রদের দল হিসেবে এনসিপির প্রতি মানুষের আগ্রহ ও দরদ, বহু পুরোনো বিএনপি ও জামাতের তুলনায় প্রগ্রেসিভ। এর কারণও আছে। এই গণঅভ্যুত্থানের আগে, বাংলাদেশে দূর অতীতে একমাত্র সফল রাজনৈতিক আন্দোলন হইছে নব্বই এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। ধরুন, যাদের নব্বই এর পরে জন্ম, বা, নব্বই এর স্মৃতি নেই, স্রেফ এর পর থিকা যাদের পলিটিকাল কনশাসনেস শুরু হল ও বড় হল যারা, আপনি দেখবেন, তাদের স্মৃতির ভেতরে কোন পলিটিকাল সাকসেসের মেমোরি নেই, তাদের জীবনকালে একমাত্র সাকসেসফুল আন্দোলন করেছে নাহিদরা, যারা গণঅভ্যুত্থান সফল করেছে। এই জেনারেশনের বাংলাদেশে ওল্ড স্কুল পলিটিকসগুলো, যেমন আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামাত, এগুলোর সাবস্ক্রাইবার হবার কারণ নেই, যদি না তাদের সেই দলগুলোর প্রতি কোন ফেমিলি বন্ডিংস থাকে। তাদের কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি পলিটিকাল বায়সানেস তৈরী নেই। এমনকি, তাদের বড় অংশ এরপরের কোন নির্বাচনেই ভোট দিতে পারে নাই, দুই হাজার ছাব্বিশের এই নির্বাচনই তাদের প্রথম ভোট। ফলে, এই জেনারেশনের ভোটের বড় অংশই এনসিপির জন্য ওপেন ছিল, বুড়ো রাজনৈতিক দলগুলোর চাইতে। আবার, যেসব আসনে এনসিপি দাঁড়ায় নাই, সেই সব আসনে তাদের ভোট বিভিন্ন জাগায় ডিসট্রিবিউট হইছে। এনসিপির ঘটনা কীরকম প্রভাবশালী, বুঝতে পারবেন, তাদের জোটের একজন, মওলানা মামুনুল হকের মন্তব্যে। জোটে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ কীভাবে করলেন, তা নিয়া উনার মন্তব্য হল, কোন জোটে যাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হেল্প করেছে সিম্পলি এনসিপি কোন জোটে যাচ্ছে, সেই সিদ্ধান্ত দেখার পর।

রিফাত হাসান : রাজনীতিতে তরুণদের প্রভাব বাড়বে, আগের মত কইরা রাজনীতির কেবল দুইটা বা তিনটা কেন্দ্র ও কাবা থাকবে না। ডাইনামিক হবে রাজনীতির চরিত্র। ফলে, এখন, এনসিপিকে নির্বাচনে নিজেদের এই ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্টের অর্থ ধরতে পারতে হবে, রাজনীতিতে ওদের আলাদা চেহারা তৈরির ব্যাপারটারে গুরুত্ব দিতে হবে। ওরা এখনই আর একটা কাজ করতে পারে। ভোট ও গণভোট পরবর্তী নাগরিক সংলাপের ডাক দিতে পারে, এনসিপির পক্ষ থেকে। কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, কৃষক, মজুর, হিন্দু, দলিত, বৌদ্ধ, চাকমা সবাইরে ডাইকা তাদের কথা শুনতে পারে। গণঅভ্যুত্থানের পরে যে কাজটা করতে ওরা ব্যর্থ হইছে বইলা মনে করি আমি। আরও একটা ঘটনা মনে করিয়ে দিতে পারি। এনসিপির রাজনীতি যাতে কেবল আওয়ামীলীগরেই কেন্দ্র কইরা না ঘোরে। এইটা একটা রিঅ্যাকশনারি লুপহোল এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিরেই কোন না কোন ফর্মে জিইয়ে রাখার কাজ করবে। আওয়ামী লীগ একই কাজ করত জামায়াতের বেলায়। ফলে, উনিশশ একাত্তর পরবর্তী জামায়াতের সোশ্যালাইজেশন হইছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের বন্ধুপ্রতিম ঐতিহাসিক বামের শাহবাগ ও আর আর রিঅ্যাকশনারি রাজনীতিগুলোর কারণে।

রিফাত হাসান : শুধু এনসিপি না, আমি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তি বাংলাদেশের রাজনীতি কেমন হতে পারে, তারে নিয়াই এরকম কিছু পর্যবেক্ষণ বলি সব সময়। ধার্মিকদের সেকুলার প্লাটফর্ম, এই শব্দটা আমি বহু বছর ধইরা বিএনপির রাজনীতিকে বোঝাতে নিয়া কইতাম, যেইটা এখানকার রাজনীতির সাধারণ চরিত্র হবে, এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠির ঐতিহাসিক সামাজিক চরিত্রের কারণে। এনসিপির আত্মপ্রকাশের সময়েও, ওদের রাজনীতি নিয়ে এরকম কিছু কথা বলেছিলাম।

আমার পর্যবেক্ষণ ছিল, বঙ্গে রাজনীতির চরিত্র হবে ধার্মিকদের সেক্যুলার প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশে ধর্মের রাজনীতি প্রাণ পাবে না। আবার, আইডিওলজি হিসেবে সেক্যুলারেরও ভাত হবে না বঙ্গে। ধর্ম, বিশেষত ইসলাম ভ্যালু ব্যবস্থা ও প্রভাবক হিসেবে হাজির থাকবে। ফলে, বঙ্গের রাজনীতি ধর্মরে নেই করে দিয়ে হবে না, বরং ধার্মিকদের সেক্যুলার প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হবে। জিয়াউর রহমানের বিএনপি ছিল, এখনতক, ধার্মিকদের সেই সেক্যুলার প্ল্যাটফর্ম। এই জায়গা থেকেই আমি কইতাম, সেক্যুলার বিএনপি বইলা কিছু হয় না। অন্তত জিয়াউর রহমানের যে বিএনপি, তারে যদি খেয়াল করেন। তো, নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির ঘোষণারে, আমি কইছিলাম, এই প্ল্যাটফর্মে বিএনপির একচ্ছত্র মালিকানা ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি করবে। এই রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা ও এসেট হলো, একটি সর্বাত্মক জনঅভ্যুত্থানে এর নেতারা নেতৃত্ব দিছেন। এর কর্মীরা সবাই তরুণ ও মাঠের লড়াকু। এর চেহারা বাংলাদেশের ট্রেডিশনাল পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আলাদা ও বৈচিত্র্যময়। এদেরে না ইসলাম না সেক্যুলার না বাম দিয়ে চিত্রায়ণ করতে পারবেন আপনি। কিন্তু এসবের মহত্ত্বর মর্মগুলো এরা ধারণ করার কথা বলে প্রায়ই। ফলে, নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, এই মুহূর্তের সবচেয়ে সেন্সিবল রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছেন ও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন এই গ্রুপ। এই দল ঘোষণার বহু আগেই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শেখ হাসিনা অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছেন, কিন্তু, এই দল গঠনের পরে, বাকি রাজনৈতিক দলগুলোর ট্রেডিশনাল রাজনীতির জন্যও একটা চ্যালেঞ্জ ও বড় প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখবে। এই দলের পরে, বিএনপি ট্রেডিশনাল রাজনীতির থেকে বেরোনো যে দরকার, তা বুঝতে পারবে। কিন্তু তারা বেরোতে পারবে না, ফলে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। জামায়াত ও বাম দলগুলোর হতাশ তরুণরা নতুন দলে ভিড়বে। বাংলাদেশে এর পরেও নতুন দল হবে, তবে যারাই নতুন দল করবে, তারা এই দলের যে চরিত্র ও ভ্যালু ব্যবস্থার নির্মাণ, তার থেকে পেছাতে পারবে না। আপাতত, এই দলের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো, এটুকুই।

রি.হা. : ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে? এরকম একটা পপুলার নোশন আছে বটে, তবে, বিদায় নিয়েছে, এরকম কোনো ব্যাপার মনে করি না আমি। একটা ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন হইছে মাত্র, বাকিদের ফ্যাসিস্ট থাকার ও হবার সব উপকরণ সমাজে ও ভ্যালু ব্যবস্থাগুলোতে বহাল রেখেই। স্রেফ শেখ হাসিনা বা যেকোনো ফ্যাসিস্টের পতন মানেই যে ফ্যাসিবাদের পতন না, এইটা আমরা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আকারে বুঝি। ফলে, এই পতনের পরে, সমাজের প্রবণতায় এখনও তেমন বড় আকারের পরিবর্তন দেখি না আমি। ফ্যাসিস্টের যে ভ্যালু ব্যবস্থা সমাজে বহাল আছে, তার কোন বড় ভাঙচুর হয় নাই। দৃশ্যমান ক্ষমতা ভেঙেছে মাত্র, তা যেকোনো মুহূর্তে আবার দাঁড়িয়ে যেতে পারে, নানান চেহারায়। তবে, মানুষের একটা মিথ ভেঙেছে, যেইটারে আমি ফ্যাসিবাদের ক্ষমতার মিথ বলি, এইটারে ঠ্যাং লুলা করে উড়িয়ে দিয়েছে গণঅভ্যুত্থান। ফলে, অনেক নতুন ও ক্রিয়েটিভ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যেমন, তরুণদের রাজনীতি।

রিফাত হাসান : এইটা একটা অপিনিয়ন হাব ছিল। এর গন্তব্য ছিল, ফ্যাসিস্টের পতন পরবর্তী বাংলাদেশটা কেমন হবে, এই বাংলাদেশে যাওয়ার যে পথ, তার রাজনৈতিক দার্শনিক আলাপ এবং তর্কগুলোরে স্পেইস দেওয়া। এই হাব শুরু করার আরও একটা কারণ এরকম ছিল, আমার মতে, শাহবাগ এবং জুলাই দুইটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটিয়েছে আমাদের। তা হলো, আপনার ক্ষমতা ও দলকানা অবগুণ্ঠনগুলোকে খুলে দিয়েছে। ফলে, ক্ষমতা ও পার্টিজান কুয়ায় ঢুকে গিয়ে যারা দুনিয়া মাপতে ব্যস্ত হলেন না এই সময়ে এসে, তাদেরকে নানানভাবে পড়া জরুরত মনে হইছে আমার। কারণ, যেকোনো ডগমাহীন আইডিয়া ও পাঠ, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই। ফলে, দেখবেন, এখানে নানান রকমের মানুষের লেখা রাখার চেষ্টা করেছি, যাদের বিচিত্র মত আছে, কিন্তু এই মতগুলো ঠিক দলকানা না। তবে, এই কাজ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট না। সম্পাদক হিসেবেও আমারে বেশ খারাপ কইতে পারেন, প্রায় আমার লেখক অবস্থার মতোই, এরোগেন্ট বা কর্কষ। বা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সহজিয়াও সম্ভবত। ফলে, এইটা আর তেমন কইরা হলো না।

রিফাত হাসান : দেখুন, পতনের পর না, ফ্যাসিবাদ, মানে ফ্যাসিস্টের পতনই হইছে বহুদিন ধইরা আমাদের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি নতুনভাবে ডিফাইন হতে থাকার কারণে। এইটা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের গত দীর্ঘ সময়ের ভ্রমণ। এই বইয়ে সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও রাজনীতি ব্যাপারটা একটা রাজনৈতিক দার্শনিক ভ্রমণের আলাপ, যা এরপরের তরুণদের চিন্তাকাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বইলা মনে করি। পরিবর্তনটা হইছে মাইক্রো লেভেলে, তরুণদের মধ্যে, ঠিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে না। ফলে, দেখবেন, পরিবর্তনে নেতৃত্বও তরুণদের মধ্য থেকে শুরু হয়েছে। ফলে, রাজনৈতিক দলগুলো যখন ব্যর্থ হল, তরুণরা তখন সফল হল। তরুণদের রাজনীতির সবচাইতে গুরু বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ফ্যাসিস্ট ভ্যালু ব্যবস্থার অংশীদার নন, রক্ষণশীলতামুক্ত, স্বাধীন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের জুলাই অভ্যুত্থানে দেখবেন, নুরদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে দেখবেন। এগুলো এক একটা নিক্তি তৈরি করে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতের আন্দোলন সংগ্রামগুলোতে কখনোই লঙ্ঘন করা যাবে না। স্রেফ এইটুকু খেয়াল রাইখেন, সামনের দিনগুলোর জন্য।

রিফাত হাসান : দেখুন, বিএনপি তো ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। গত ষোল বছর ধরে রাজনৈতিক দল হিশেবে বিএনপির, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র, যিনি এখন প্রধানমন্ত্রী, সেই তারেক রহমানের সাফারিংস, এবং অসংখ্য নেতা কর্মীর ত্যাগ ও ফ্যাসিস্ট বিরোধী লড়াই এর সিলসিলার ফলও এই গণঅভ্যুত্থান, যা তারা সেইভাবে এওয়ার বইলা মনে হয় না। নিজেদের এই লড়াই, আশা করি, তারা সহজে ভুলবে না। তবে তারা কিছু ভুল করবে, যেহেতু ক্ষমতার চরিত্রই ভুল করা ও চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া।

ফলে, আমি একই সাথে হোপফুল এবং সংশয়ে থাকতে চাই। নির্বাচনের পর, সংসদ অধিবেশন শুরু হল মাত্র, মন্তব্য করার জন্য পর্যাপ্ত সময় না এখনো। আমার হোপফুল থাকতে চাওয়াটা হলো, ফ্যাসিস্টের সময়ে নির্যাতিত ও জিয়াউর রহমান পুত্র তারেক রহমানের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও হোপ। কিন্তু, এই হোপ নিয়ে একই সাথে আমাদেরকে সন্দিহানও থাকতে হচ্ছে, বিএনপি ও তারেক রহমানের নানান কনফিউজড ও অস্বচ্ছ অবস্থানের কারণে। বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় দল হলেও এর আগে বিএনপি দুইটা ঐতিহাসিক মুহূর্তরে ঔন করতে ব্যর্থ হইছে, আমার রিডিং বলে। এক. গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থতা। দুই. হাঁ ভোটের পক্ষে দ্বিধাহীন অবস্থান নিতে ব্যর্থতা, যার কারণে বিএনপি প্রকাশ্যে হাঁ ভোটের পক্ষে কথা কইলেও, গোপনে না এর প্রচারে ব্যস্ত ছিল, যেইটাতে তারা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হইছে। হাঁ ভোট, এমনকি বিএনপির ধানের শীষকে দেওয়া ভোটারদেরও সিংহভাগের ভোট পেয়েছে ও জিতেছে। সর্বশেষ, নির্বাচনে বিজয়ী হবার পরে, তৃতীয় আর একটা মোমেন্টামরে ধরতে পারার ও ঔন করার ব্যর্থতা যোগ হলো বিএনপির ঘরে, সেটি হলো, প্রথম দিনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে রাজি হতে ব্যর্থতা। এই রাজনৈতিক দ্বিধা ও রক্ষণশীলতাগুলোকে ইতিহাস মনে রাখে। আমরা ইতিহাসে দেখি, জামাত ঐতিহাসিক ডিলেমা ও ধর্মীয় মৌলবাদ দিয়ে মোকাবিলা করেছে এই অঞ্চলের মানুষের আন্দোলন সংগ্রাম ও অর্জনগুলোকে। সাতচল্লিশে পাকিস্তান আন্দোলন ও একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রশ্নে। এই দ্বিধা ও ডিলেমাগুলো জামায়াতকে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা দিয়েছে। এখন, এই একই ডিলেমার এজেন্সি বিএনপি নিল কি, ইতিহাসের পরপর তিনটা ভুল সাইডে দাঁড়িয়ে? বিএনপির এই ইতিহাসের ভুল সাইডে দাঁড়ানোর পয়গম্বর কারা, আমি বুঝতে চাই। আশা করছি, সংসদ যখন পুরোপুরি শুরু হবে, সামনের দিনগুলোতে আরও পরিষ্কার হবে বিষয়গুলো।

রি.হা. : আদর্শ তো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, ক্ষমতা আদর্শ দিয়ে চলে না, আদর্শের চাইতেও, তাকে একটা ‘আদর্শবাদ’ তৈরি করতে হয়। এইটারে একটা হেজেমনিয়াল টুলে রূপান্তর করতে হয় প্রথমে। এই আদর্শবাদগুলো, বা আদর্শভিত্তিক সমাজকাঠামো রিজিড চরিত্রের, কনফিউজিং ও নিপীড়নমূলক ঘটনাও। যেমন, এনিমেল ফার্মের শুয়রেরা, সম্ভবত সেভেন কমান্ডমেন্টস ব্যবহার করত অন্য পশুদের উপর ডমিনেন্সির বৈধতা তৈরির জন্য, শেখ হাসিনা যেমন মদিনা সনদ ও মুক্তিযুদ্ধ ব্যবহার করতেন জনগণের ওপর ডমিনেন্সি বজায় রাখার বৈধতা তৈরির জন্য। আদর্শভিত্তিক সমাজকাঠামো মানে কিন্তু এই রিজিড অবস্থাই।

ফলে, আপনার একটা আদর্শ থাকার ব্যাপার আছে, যেইটারে আমি মূল্যবোধ বলি। কিন্তু, ‘আদর্শবাদ’থাকা চলবে না, বা, আইডিওলগ হওয়া যাবে না। মানে, আদর্শ যাতে স্রেফ একটা সেট অব রুলসের মূর্তি না হয়ে ওঠে। এইটা, সব সময়ই একটা ফ্যাসিস্ট সম্ভাবনা তৈরি করে। এই জায়গা থেকেই, আমার কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একটা ধর্মরাষ্ট্র তৈরির বিরোধী আমি। রাষ্ট্রীয় পরিসরে, আদর্শিক জায়গা থিকা আমি যে কোন পিউরিটান, যেমন আমাদের পরিচিত ডান ও বামের মত মৌলবাদগুলোকে প্রত্যাখ্যান করি। ধর্মরাষ্ট্র বা ধর্মীয় শক্তি নয়, রাষ্ট্রের ভেতরে উদার ধর্মীয় টলারেন্ট সোসাইটি চাই আর ধার্মিকদের আদার কইরা যে সেক্যুলার রাষ্ট্র, তার বাইরে আইসা ধার্মিকদেরও সেক্যুলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যে রাষ্ট্র তৈরি হবে, আমার আলাপ সেই রাষ্ট্রের জন্য। এই জন্যই, আমি আদর্শবাদের চাইতে, একটা সেক্যুলার মোরালিটির গুরুত্বের কথা বলি।

রিফাত হাসান : দেখুন, আমরা যে সোসাইটিতে আছি, তার রুহ হলো ধর্ম। এখানকার বৃহৎ জনগোষ্ঠী মুসলমান। হিন্দু আর বৌদ্ধরাও আছে প্রচুর পরিমাণে। দেখবেন, তাদের চরিত্র হলো ধার্মিক। ধর্মীয় ভ্যালুগুলো প্রাধান্য পায় জীবনযাপন ও সব মীমাংসায়, কিন্তু, এখানকার মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ সবাই একটা টলারেন্ট সোসাইটি ও স্পিরিচুয়াল মাইন্ড বিলং করে। এখানকার মুসলমানদের যে পরিচয়, তারে আমরা বাঙালি মুসলমান বলি। এই বাঙালি মুসলমান ব্যাপারটা এমন, এখানে আরব থেকে আগতরা ব্যবসায়ি ও সুফিরা যেমন, ইতিহাসের নমঃশূদ্র, চণ্ডাল, দলিত, কৃষিজীবী, কাঠুরে, জেলে ও আর আর বর্ণহীন, অনার্য স্বাধীন নৃগোষ্ঠীও সমহিমায় বিরাজ করে, বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে। ফলে, দেখবেন, পাশের দেশ ভারতে যে ধর্মীয় ইনটলারেন্স, উগ্রতা, গরুর গোশত খাওয়ার অপরাধে পিটিয়ে মানুষ খুন, এরকম আমাদের নেই। একটা চমৎকার স্পিরিচুয়াল মাইন্ড এবং ধর্মীয় সহাবস্থান, এখানে পাশাপাশি চলে। মানে, ধার্মিক হলেও, মুআমেলাতে সেক্যুলার থাকতে পারি আমরা। তো, রাজনীতিতে সোসাইটির এই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্ররে বুঝতে ও ধারণ করতে পারার একটা ব্যাপার আছে। ধর্ম এবং সহাবস্থান, এই উভয় চরিত্রের কোনোটারেই আদার করা যাবে না। জনতার সঙ্গে সম্পর্ক মানে তো এই সোসাইটির সঙ্গে সম্পর্ক। তার জন্য তো এই সোসাইটিরে বুঝতে এবং গ্রহণও করতে পারার ব্যাপার আছে।

কিন্তু, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাম বা ধর্মীয় দলগুলো, যেহেতু মূলত আইডিওলগ, তারা এই উভয় চরিত্র একই সঙ্গে ধারণ করতে অক্ষম। যেহেতু আইডিওলগ, ফলে, এইটা একটা কুয়ার সমস্যাও। এরা নিজেদের একটা কুয়া তৈরি করে তার ভেতরে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাস করে। তাদের প্রায়ই দুইটা প্রধান চরিত্র দেখবেন। এক. ওরা নিজেরা, নিজেদের পরিসরে অসম্ভব ডিসিপ্লিনড ও সহোদরা। এই জাগায় তারা অসম্ভব শক্তিশালী। দুই. ওরা জনপরিসরে অসম্ভব নিয়ন্ত্রণপ্রবণ ও শত্রুভাবাপন্ন। তাদের কোনো সোসাইটিই নেই তেমন কইরা। জামাত রাজনীতিরে খেয়াল করেন। বাম দলগুলোর রাজনীতিরেও খেয়াল করেন। সমাজের রুহের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ও যোগাযোগ নেই। অথচ, খেয়াল করবেন, ওদের ব্রাদারহুড ও কমরেডশিপের ভেতরে ওরা প্রত্যেকেই অনন্য। কিন্তু, অন্যরা, তাদের কাছে আদার। নাস্তিক, মৌলবাদী, জঙ্গি, কাফের, শ্রেণিশত্রু, মুরতাদ ইত্যাদি। আমি একটা কথা বলি সব সময়, রাজনীতি হলো মূলত সম্পর্কের জ্ঞান। এই জায়গাটারে ওরা স্বীকার করে না, তাদের রাজনীতি মানে হল নিয়ন্ত্রণ ও নিজ নিজ ভ্যালু ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া। ফলে, ওরা, অন্য দলগুলোর তুলনায় নিয়ন্ত্রণের জায়গায় একধাপ এগিয়েই থাকে। এই জায়গা থেকেই, আমি বলি, বাংলাদেশে বাম রাজনীতি বা ইসলামি রাজনীতি ধরনের রিজিড আদর্শপূজক ঘটনাগুলোর তেমন ভবিষ্যৎ নেই। এসবের বাইরেই বেরোতে হবে। আমাদের মূলত দরকার রক্ষণশীলতা/মৌলবাদমুক্ত নয়া রাষ্ট্র ও রাজনীতি ভাবনা, যারে স্রেফ বাম বা ইসলামি নাম দিয়া বোঝানোর দরকার হবে না বা সম্ভব না।

রিফাত হাসান : সমাজ স্কুল বা পাঠশালা না, সত্য। কারণ, স্কুল বা পাঠশালায় আমরা বসবাস করি না। কিন্তু, সমাজে বসবাস করি। যেহেতু কী চলবে বা চলবে না, এমন সিদ্ধান্ত নিতে চান, ধরে নিতে হবে, আমরা একই সথে একটা নিয়ন্ত্রণের ভেতরে অলরেডি বসবাস করছি। সেটি স্রেফ সমাজ নয়, আরো নিয়ন্ত্রক, অমনিপটেন্ট কিছু। যেমন, রাষ্ট্র। মানে, আধুনিক রাষ্ট্রের ভেতরে, ইনডিপেনডেন্ট, অটোনোমাস সমাজ বইলা কিছু তেমন কইরা একজিস্ট করে কি আসলে? ফলে, এইখানে অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করা হয়, এইটা ধরে নিয়েই এই আলাপ। তো, রাষ্ট্রের যে দায়গুলো কল্পনা করেন, যেই দায়গুলো না থাকলে, রাষ্ট্র, বা আপনার অস্তিত্ব থাকবে না, তার মধ্যে কী কী আছে? যেমন, আপনি দেখবেন, ধূমাপন নিয়া একটা বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়, বিড়ির প্যাকেটে, এমনকি সিনেমাগুলোতেও। যে, আপনি মৃত্যুমুখে পতিত হইতেছেন। এইটারে, যদিও, আমি টোব্যাকো কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন হিসেবেই পড়ি। তবে, আমি এই জাগায় নিকোলাই গোগলের একটা গল্পের রেফারেন্স দিই সবসময়। শিল্প নিয়া। মধ্যবর্তী বেঞ্চটাতে বইয়ে কামরুল হাসানের ‘পিশাচ’নামে একটা লেখা আছে, যেটির শুরু এভাবে : নিকোলাই গোগলের কোনো একটা গল্প আমারে প্রায়ই ভাবায়, যেখানে একটা ছবি, মূলত পোর্ট্রেইট, দর্শকদের মনে নৈরাজ্য তৈরি করে। এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে ও আত্মহত্যা করতে থাকে, যারা যারা এই ছবির সংস্পর্শে এসেছিল, একে একে সবাই। কামরুল হাসানের আঁকা ইয়াহিয়ার বিকট ছবি ও সেই ক্যাপশন, ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ হল নিকোলাই গোগলের সেই নৈরাজ্যের শিল্প। কামরুল হাসানের এই ছবি আমাদের গণমুক্তিযুদ্ধ ও আন্দোলন সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে পরে, যা গণঘৃণা তৈরিতে ব্যবহৃত হতে থাকে। এই যে সিম্বল হয়ে ওঠা, এই ঘটনারে আমি একটা সমাজের অসুস্থতা হিসেবে পাঠ করি। এই ছবিটাই, বা এই ছবির সঙ্গে যে সেøাগান ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’ একটি গণহত্যার প্ররোচনামূলক সেøাগান। যদিও ইয়াহিয়াই বাংলায় গণহত্যা চালিয়েছিল, এই পোস্টার বলে, ‘আমরা’ও, ক্ষমতা হলে একদিন ‘এই জানোয়ারদের’ হত্যা করতে থাকব। মানে, দ্বিতীয় ও আরও অসংখ্য গণহত্যার কলেমা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে এই শিল্প। এই জানোয়ার কারা? অনির্দিষ্ট শত্রুরা, যার অসীম সংখ্যক সংজ্ঞা সম্ভাবনা থাকে। এই গণহত্যাকাঙ্ক্ষা আর গণহত্যার মধ্যে যে ফারাক, তা সামান্যই। যেমন, স্বাধীনতার পরেও এই ছবি ব্যবহারকারীদের প্রিয় স্লোগান হলো, ‘ধরে ধরে জবাই কর’, যেটি শাহবাগের গণজাগরণমঞ্চের সময়ে পপুলার হইছিল। এই গণহত্যাকাঙ্ক্ষার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গন্তব্য বেশ পরিচিত আমাদের।

রি. হা : দেখেন, সমাজে একটা অন্যায় ঘটার পরে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এথিকাল ডিলেমা। জুলাই ম্যাসাকারের পরে আমাদের রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশের মধ্যে এই এথিকাল ডিলেমা তৈরী হয় নাই। ওরা সব সময়কার মত সুবিধাবাদি ও দালাল থেকেছে, অথবা, গর্দভ ভান কইরা থাকারেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে। এইটা, সবার আগে, একটা সমাজের সিরিয়াস নৈতিকতার সংকট। এই সংকট আমাদের সিভিল সোসাইটি ও বুদ্ধিজীবী সমাজের ঐতিহাসিক চরিত্র, সাহিত্যিক আবুল ফজল সপরিবারে মুজিব হত্যার পরে তার আশেপাশের ও সাহিত্য পরিমন্ডলের লোকেদের মধ্যে এই সংকট দেখেছিলেন। এখন প্রশ্ন করেন, এই এথিকাল সংকটরে কতটা বুঝতে পারে নতুন শুরু হওয়া সংসদ, বা জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তি ক্ষমতায় আসা বিএনপি? আওয়ামীলীগের ফেরার যে প্রশ্ন করছেন, তার সাথে এই প্রশ্ন জড়িত।

রাজনীতির তো ভেকুয়াম পছন্দ না। আওয়ামী লীগ যদি মেচিওরড মুভ নিতে সক্ষম হয়, এই ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থার শ্যাডো অবস্থা থেকে বের হয়ে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে নিজেদেরকে নতুন পরিস্থিতির জন্য তৈরি করতে পারে, নতুন ধরনের নেতৃত্ব তৈরি ও জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী তাদের নতুন রাজনীতি কী হওয়া উচিত, তারে লইয়া ভাবতে পারে, তখন হয়তো, তাদের নতুনভাবে ফিরে আসার পথ তৈরি হবে, তারেক রহমান পথ তৈরি করুন বা না করুন। সেটি কেমন হবে? শিওর না। এর অনেক রকম ফর্ম হয়তো ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, নানান নামে। সেই নামগুলো, আমাদের আশে পাশেই দেখবেন।

রিয়েলিটি হল, আওয়ামীলীগের রাজনীতির মৃত্যু হয়েছে যদিও, আওয়ামী লীগ পুরোমাত্রায় বহাল আছে রাষ্ট্রের কায়েমি এসটাবলিশমেন্টগুলোতে ও উপরে কওয়া সিভিল সোসাইটি ও তাদের কনসেন্ট মেনুফেকচারিং মেকানিজমগুলোতে। এইটা ভাঙে নাই। তাদের দলের বড় নেতারা নেই, কিন্তু, মনে রাখতে হবে, তাদের সাধারণ সমর্থক, যারা হারিয়ে যায় নাই, তাদের জিরোনোর স্পেস তৈরি করতে পারে নাই অভ্যুত্থানপন্থি দলগুলো। আর, ওই যে বললাম, একটা ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন হইছে মাত্র, বাকিদের ফ্যাসিস্ট থাকার ও হবার সব উপকরণ সমাজে ও ভ্যালু ব্যবস্থাগুলোতে বহাল রেখেই, এই ফ্যাসিস্ট আর স্বৈরাচার সম্ভাবনা অন্যান্য দলের যে নেই, তা তো না। ক্ষমতায় আসার পরে, নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপির জেশ্চারও এখনও পরিষ্কার নয়। যেহেতু জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়েও আগ্রহী না আমি, অনুমানের চাইতে, সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিশেবে কেন আওয়ামী লীগের জন্য ফেরা এত সহজও না, তার আলাপ করতে পারি। ফেরা কঠিন হলো কি না, পথ প্রশস্ত হলো, এই ব্যাপারটা এখান থেকে অনুমান করা সম্ভব।

রি. হা : না। প্রথমত ফেরা যদি কঠিন হয়, এইটা ঠিক নির্বাচন বা বিএনপির ক্ষমতা গ্রহণের জন্য না, বরং দেশে যে একটা সর্বাত্মক জুলাই গণঅভ্যুত্থান হলো, তার জন্য। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমান ফ্যামিলি এবং দল হিশেবে আওয়ামী লীগের একটা রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের আগেই, দেশের মানুষের কাছে যেমন, তাদের দলের সমর্থক আর নেতাকর্মীদের কাছেও। কারণ, এই সময়ে গুম, খুন ও নানান মার্সেনারি গ্রুপের মাধ্যমে ব্যাংক দখল ও লুটপাট ম্যানেজমেন্টের বাইরে তাদের কোনো রাজনীতি ছিল না। হাসিনার সময়েও, আওয়ামী লীগ নামে কোনো রাজনৈতিক চরিত্রের দল তেমন কইরা একজিস্ট করত না, এই মার্সেনারি গ্রুপগুলোরে খুশি করার ব্যাপার ছাড়া। পাশাপাশি, জুলাই ম্যাসাকারের পরে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতির অধিকারটা একটি এথিকাল দায়ের ফয়সালার ব্যাপারও, যারে ইগনৌর কইরা সামনে আগানো কঠিন হওয়ারই কথা। এই নিয়া আমি আওয়ামী লীগ নেতাদেরও একাংশকে কথা কইতে দেখছি, বিদেশ থেকে পরিচালিত কিছু টকশোতে। মানে, তারাও এই বিষয়ে এওয়ার। ফলে, আমি যেটুকু বুঝি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের যে আওয়ামী লীগ ছিল, তার ফেরার সম্ভাবনা হয়তো আর নেই। অন্য ফর্মে যদি আসার চেষ্টা হয়, সেটি কেমন হবে, তা নিয়ে হয়তো ভাবা যেতে পারে।

রি. হা : আবারও বলছি, এই প্রশ্নের উত্তর জোতিষবিজ্ঞান দিয়ে হবে না। আমার ধারণা হল, ফেরা সম্ভব না। শেখ হাসিনা যুগের যে সমাপ্তি হইছে, এইটা, হাসিনার পতনের পর, তাদের ইন্ডিয়ান মিত্র শশি থারুরের বক্তব্য, এমনকি শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওযাজেদ জয়েরও এরকম একটা ইশারা আছে, সাম্প্রতিক আলজাজিরার ইন্টারভিউতে পাবেন। তবে, কেউ কেউ মনে করছেন, একটা ইন্ডিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ব্যাকড শ্যাডো আওয়ামী লীগকে ফেরানোর চেষ্টা করা হবে, যেখানে শেখ হাসিনা আর ট্রাইব্যুনালে অপরাধী সাব্যস্ত নেতারা থাকবেন না। এইটা তারেক রহমানের সময়েই হতে পারে। এরকম কিছু সমঝোতার কথা তো গুঞ্জন আছেই, ইন্ডিয়ার দিক থেকে আওয়ামী লীগকে ফেরানোর এরকম একটা দায় থাকার কথা, যদি তাদের প্রাগৈতিহাসিক মৈত্রিরে বিবেচনায় রাখি।

রি. হা : হাঁ, ধরুন, এসবই হলো না। তাও, আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে পারবে কি পারবে না, তা ঠিক নির্বাচন নয়, অভ্যুত্থানোত্তর নয়া ক্ষমতা তৈরি হবার প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত। খারাপ ব্যাপার হল, সেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষমতা তৈরি হতে পেরেছে বইলা আমি মনে করি না, যে ক্ষমতার কারণে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নাজি পার্টিরে নিষিদ্ধ করতে জার্মানিতে আদালতের আদেশ লাগে নাই, তাদের সোশ্যাল কনসেনসাস ছিল। তবে, খেয়াল করবেন, এই নির্বাচনের ফলাফলে সেই রাজনৈতিক ক্ষমতার ইশারা ও ম্যান্ডেট আছে, গণভোটের হাঁ জয়ের গুরুত্ব যদি বুঝে থাকে দলগুলো। আরও খেয়াল করুন, অভ্যুত্থানের ছাত্রদের থেকে ওঠে আসা দল এনসিপি ৩০টি আসনে ২২ লক্ষের কম বা বেশি ভোট পেয়েছে। সারা দেশে তাদের এই ম্যান্ডেট আরও বিভিন্ন প্রতীকে ডিসট্রিবিউট হয়েছে, যেহেতু বাকি আসনগুলোতে তারা সরাসরি ক্যান্ডিডেট ছিল না। প্রথমটি, হাঁ ভোট হলো সরাসরি জনম্যান্ডেট। দ্বিতীয়টি, যেটি এনসিপির ভোট, সেটি হলো, এই জনম্যান্ডেট রাজনীতিতে কীভাবে প্রতিফলিত হবার সম্ভাবনা আছে, তার ইশারা। এই ইশারারে যদি ধরতে পারেন ও গুরুত্ব দেন রাজনৈতিক দলগুলো, তারা এর অর্থ বুঝতে সক্ষম হবেন।

সমাজ স্কুল বা পাঠশালা না, সত্য। কারণ, স্কুল বা পাঠশালায় আমরা বসবাস করি না। কিন্তু, সমাজে বসবাস করি। যেহেতু কী চলবে বা চলবে না, এমন সিদ্ধান্ত নিতে চান, ধরে নিতে হবে, আমরা একই সথে একটা নিয়ন্ত্রণের ভেতরে অলরেডি বসবাস করছি। সেটি স্রেফ সমাজ নয়, আরো নিয়ন্ত্রক, অমনিপটেন্ট কিছু। যেমন, রাষ্ট্র। মানে, আধুনিক রাষ্ট্রের ভেতরে, ইনডিপেনডেন্ট, অটোনোমাস সমাজ বইলা কিছু তেমন কইরা একজিস্ট করে কি আসলে? ফলে, এইখানে অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করা হয়, এইটা ধরে নিয়েই এই আলাপ।

রি. হা : বুঝবেন, যদি তারা আওয়ামীলীগের রাজনীতি যে প্যারামিটারগুলোর উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো ভেঙে দিতে সমর্থ হয়, নিজেদের রাজনীতি ও গণসম্পৃক্ততার মাধ্যমে। মানে, এই নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা কঠিন হবে, যদি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি এই ম্যান্ডেটের অর্থ বুঝে মেচিওরড রাজনীতি করে। যেমন, বিএনপি বা অন্য দলগুলো যদি দুটি কাজে সফল হয়। এক. ইতিহাস নিয়ে আওয়ামী লীগের ধর্মপ্রকল্পগুলো ভেঙে দেওয়া। যেইটা শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মযুদ্ধ আকারে খাড়া করেছিলেন আমাদের জন্য। দুই. গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে ও এই ধর্মপ্রকল্প ভেঙে দেওয়ার পক্ষে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কালচারাল স্পেস তৈরি করা। কারণ, এই ভেঙে দেওয়া স্রেফ ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব না। ক্ষমতা তো ক্ষণস্থায়ী, শেখ হাসিনার মতোই ভঙ্গুর ও সুযোগ বুঝে পালায়। ভাঙা মানে তো, গড়াও। এইটা সম্ভব হবে কেবল শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কালচারাল স্পেস তৈরি করার মাধ্যমে। তো, এই রাজনৈতিক স্পেস তৈরির জন্য ও এই সময়ের ভেকুয়াম পূরণের জন্য শক্তিশালী সরকার ও প্রশাসন যেমন দরকার, শক্তিশালী বিরোধী দলও দরকার। শুধু কোনো একক দলের ক্ষমতা না। নচেৎ, আওয়ামী লীগ ফিরুক না ফিরুক, দেশে একটা দুর্বল রাজনৈতিক কাঠামোই বজায় থাকবে, যা টোকা পড়লেই ভেঙে পড়বে। এর জন্য, উনিশশ একাত্তর-পরবর্তী আকাশচুম্বী জনপ্রিয় শেখ মুজিবুর রহমানের যে আওয়ামী লীগ, তার থেকে শিক্ষা নিতে পারে। বিরোধী দলকে নেই করে দিয়ে তিয়াত্তরের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, যা তিনি দুই বছরও টেকাতে পারেন নাই। প্রফেসর রাজ্জাকের এই নিয়া একটা উষ্মার কথা শোনা যায়, ছফার সাথে আলাপে, উনি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে এই উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। দুই বছর যেতে না যেতেই, পঁচাত্তরে প্রথমত, বাকশালের মাধ্যমে সেই আওয়ামী লীগকেই বিলুপ্ত করতে হইছিল। পরে, পনেরোই আগস্ট মর্মান্তিকভাবে সপরিবারে নিহত হইছিলেন সেনা অভ্যুত্থানকারীদের হাতে, স্বয়ং মুজিব। ফলে, শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক স্পেস তৈরির প্রশ্নটিরে ফ্যাসিলিটেইট করা গুরুত্বপূর্ণ, সবার আগে।

রি. হা : মনে তো হচ্ছে। এমন কি, আমার সন্দেহ আছে, তারা আদৌ সামনেও এইটা পারবে কিনা। তারা যে এইটা পারবে না, বা পারছে না, তার ইশারা নির্বাচন-পরবর্তী কয়েক দিনে কিছুটা স্পষ্ট মনে হইছে আমার। এই অবস্থায়, রাজনীতির তো ভেকুয়াম পছন্দ না। আওয়ামী লীগ যদি মেচিওরড মুভ নিতে সক্ষম হয়, এই ইন্ডিয়ান গোয়েন্দা সংস্থার শ্যাডো অবস্থা থেকে বের হয়ে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে নিজেদেরকে নতুন পরিস্থিতির জন্য তৈরি করতে পারে, নতুন ধরনের নেতৃত্ব তৈরি ও জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী তাদের নতুন রাজনীতি কী হওয়া উচিত, তারে লইয়া ভাবতে পারে, তখন হয়তো, তাদের নতুনভাবে ফিরে আসার পথ তৈরি হবে, তারেক রহমান পথ তৈরি করুন বা না করুন। সেটি কেমন হবে? শিওর না। এর অনেক রকম ফর্ম হয়তো ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, নানান নামে। সেই নামগুলো, আমাদের আশে পাশেই দেখবেন।

রি. হা : আপনাকেও ধন্যবাদ।

যুবা রহমান, কবি। সাংবাদিক। সম্পাদক।

Leave the first comment